আমি ওয়ালটনের বিশাল বড় ফ্যান ছিলাম একসময়। তাদের বেশ কয়েকটি পণ্য ব্যবহার করেছি। তবে বউয়ের প্ররোচণায় পড়ে ওদের একটি ফ্রিজ কিনেই ধরাটা খেলাম। পণ্যে তো সমস্যা ছিলই, তদুপরি সেলসপার্সনগুলো যেভাবে মিথ্যাচার করেছে, তাতে আমার ভোগান্তি আরো বেড়েছে। শুনলাম এটা নাকি শেখ রেহানার কোম্পানী, তাই বোধ হয় আওয়ামী লীগের ক্ষমতার শেষপ্রান্তে এসে তারা যাচ্ছেতাই করে যাচ্ছে। যেসব পণ্যে তারা দশ বছরের ওয়ারেন্টি দিচ্ছে, সেগুলোতে আদতে তারা দুই বছর ওয়ারেন্টি দিতে পারবে কিনা তা নিয়ে আমার সংশয় আছে। কারণ বর্তমান সরকারের আমলে ওদের বিজনেস যেমন চৌদ্দগুণ বেড়েছে, ঠিক তেমনি বিএনপি ক্ষমতায় আসলে মোটেই টিকতে পারবে কিনা সেটাই দেখার বিষয়।
ওয়ালটনের কর্মীদের মিথ্যেচার
অাসলে ওয়ালটনের ফ্রিজ কেনার ইচ্ছা আমার কোনোদিনই ছিল না। সেটা করেছি বউয়ের ঘ্যানঘ্যানানিতে বিরক্ত হয়ে। সে বরাবরই বলে এসেছিল, ‘আমাদের অত বড় ফ্রিজ দরকার নেই, ছোটখাট হলেই চলবে।’ ওর বাপের বাড়ির এক প্রতিবেশী ওয়ালটন ফ্রিজ কিনেছে, তাই আমাকেও সেটা কেনার জন্য তাগিদ দিচ্ছিল। প্লাস, বহুস্থানে ওয়ালটনের সার্ভিসিং সেন্টার আছে (তখন ঢাকার বাইরে চলে যাবার প্ল্যান ছিল) – এটা বিবেচনা করে হলেও শেষ পর্যন্ত কুরবানী ঈদের আগে ছাড়ে ওয়ালটনের ফ্রিজ কিনলাম। অরিজিনাল মূল্য নাকি সাড়ে একত্রিশ হাজার, সেটা আমার কাছে সাড়ে আঠাশে বেচলো, অর্থাৎ তিন হাজার টাকা ছাড় দিল।
এখন আপনারাই বলুন, যে ফ্রিজের দাম সাড়ে আঠাশ হাজার, তার স্ট্যাবিলাইজারের দাম কি চার হাজার হওয়া উচিত? মোটেই না। তাহলে বুঝা যাচ্ছে, আসলে এক থেকে দেড় হাজার টাকা ওরা নিজের পকেটস্থ করতে চাচ্ছিল। ফ্রিজটা কিনেছিলাম কুড়িলে অবস্থিত ওয়ালটনের কর্পোরেট শোরুম থেকে। স্ট্যাবিলাইজারের দাম শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ওখানকার সিনিয়র স্যালস পার্সনকে জিজ্ঞেস করলাম, স্ট্যাবিলাইজার ছাড়া চলবে কি না। সে মাথা অন্য দিকে ঘুরিয়ে বললো, চলবে। অর্থাৎ সেটা ছিল একটা ডাহা মিথ্যা কথা। কারণ স্ট্যাবিলাইজার ব্যবহার না করলে ফ্রিজের ক্ষেত্রে ওয়ারেন্টি প্রযোজ্য হয় না, সেটা ওদের ওয়ারেন্টি বুকেই লেখা আছে। তাহলে এই মিথ্যেচার কেন?
আরেকটি মিথ্যেচার হলো এই যে, ছাড়ের অফারটি সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখ পর্যন্ত প্রযোজ্য ছিল। কিন্তু আমি ওখানে গিয়েছিলাম ২ তারিখে, অর্থাৎ ঈদের আগের দিন। তাড়াহুড়া করে ফ্রিজের মতো বড় একটা অ্যাপ্লায়েন্স কেনার ইচ্ছে আমার ছিল না। তাই সেখানে ঢুকেই একজন জুনিয়র সেলস পার্সনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ছাড়ের শেষ দিন কবে?’ সে জানালো, ঐদিনই ছিল শেষ দিন। এটাও ডাহা মিথ্যে কথা। ওয়ালটনের মতো বড় একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা যে এভাবে ঢালাও মিথ্যা বলবে সেটা আমার কল্পনাতীত ছিল।
মেলা বা ছাড়ে বড় ধরনের পণ্য কিনবেন না
অবশেষে যা হবার তাই হলো, ফ্রিজটি কেনার ছয় মাস পার হবার আগেই সেখান থেকে বিকট ঘড়ঘড় শব্দ তৈরি হচ্ছে। সার্ভিস করাব ভেবে যেই না ওদের বুকলেটটা বের করলাম, তখনই দেখতে পেলাম যে, স্ট্যাবিলাইজার ব্যবহার না করলে ফ্রিজে ওয়ারেন্টি কার্যকর হবে না। এবার বুঝুন আমার অবস্থা!
আবার এমনও হতে পারে, পণ্যটিতে আগে থেকেই সমস্যা ছিল। আমার একটা পারসেপশন হলো এই যে, মেলা বা ছাড়ে লো কোয়ালিটির প্রোডাক্ট বিক্রি করা হয় এবং যেগুলোর সমস্যা বেশি সেগুলো সামনের দিকে সাজিয়ে রাখে যাতে সহজেই দৃষ্টিগোচর হয়। তাই বাহ্যিক চাকচিক্যে দামী ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক পণ্য না কেনাই ভালো। আমার ফ্রিজটি বাইরে থেকে দেখতে দারুণ ছিল, তাই সেটা কিনেছিলাম। ওয়ালটনের সব ফ্রিজই যে খারাপ তা নয়। আমি ছাড়ে কিনেছিলাম, বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে; তদুপরি সেলসম্যানদের মিথ্যেচারে বিশ্বাস করেছিলাম, তাই ধরা খেয়েছি। যেখানকার সেলসপার্সন ওরা, সেটা ওয়ালটনের একটা কর্পোরেট শোরুম (কুড়িল), ঐরকম জায়গায় এরকম ব্যবহার প্রত্যাশা করি নি আমি।
ওয়ালটনের কাটতি বেড়েছে, তাই এখন ওদের গা ঘেঁষা কষ্টকর
নিরুপায় হয়ে ওদের হেল্পলাইনে (১৬২৬৭) বেশ কয়েকদিন কল দিলাম, প্রতিবারই বন্ধ পেয়েছি। সম্ভবত বাণিজ্য মেলা উপলক্ষ্যে ওদের সব কল সেন্টার কর্মীকে মেলায় স্থানান্তরিত করা হয়েছিল, শুধু জানুয়ারী মাসের জন্য। এক মাসের জন্য হলেও ব্যাপারটা বেশি অমানবিক এবং অপেশাদার।
দেশি পণ্যের নামে ওরা যেসব বিক্রি করছে, সেগুলো পুরোপুরি দেশে উৎপাদিত তো নয়ই (সিম্পলি এসেম্বল্ড), বরং একেবারে গার্বেজ বলা চলে। শুধু ফ্রিজ কেন, আরো কয়েকটি পণ্য ওদের কাছ থেকে কিনে এখন সরষে ফুল ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। মেলা বা ছাড়ে জিনিসপত্র কিনতে মানা করলাম এই কারণে যে, এর আগেও কম্পিউটার মেলা থেকে এসার-এর একটি ল্যাপটপ কিনেছিলাম, সেটা একটা জঘন্য পণ্য ছিল।
অার ওয়ালটনের সাথে শেখ রেহানা যদি সত্যিই সংশ্লিষ্ট হয়ে থাকে, তাহলে ক্ষমতার শেষ বছর হিসেবে ওরা আরো বেশি মরিয়া হয়ে আরো বেশি আজেবাজে প্রোডাক্ট গছিয়ে দিতে চাইবে জনসাধারণকে, তাই সকলকে ওয়ালটন পণ্য কেনার আগে দ্বিতীয়বার ভেবে নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছি।
1 thought on “ওয়ালটন পণ্য কেনার আগে দ্বিতীয়বার ভাবুন”