ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ হটসিটে বসে আছেন।
তাকে ঘিরে রয়েছে অনেক ক্যামেরা। জাকারবার্গ যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টার সেশনে সাক্ষ্য দিয়েছেন চলমান ক্যামব্রিজ অ্যানালাইটিকার তথ্যের গোপনীয়তা সংক্রান্ত কেলেঙ্কারির বিষয়ে।
শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছুক ফেসবুক নির্বাহীকে কিছু প্রশ্নের জবাব দিতে হয়েছে। অন্যথায় শুনানিটি ছিল ব্যর্থ। এটিকে সাজানোই হয়েছে ব্যর্থ করার জন্য।
এটি এমন একটি শো ছিল, যা সাজানো হয়েছে ফেসবুকপ্রধানকে কয়েক ঘণ্টা পর ওয়াশিংটন ডিসিতে শাস্তি থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য।
এটি ছিল এমন একটি শো, যেখানে প্রকৃত শুনানির আগে শুনানির ভান করানো হয়েছে। এটি সাজানো হয়েছে পরিবর্তন ঘটানো ও বিভ্রান্তি তৈরির জন্য।
প্রত্যেক সিনেটরকে প্রশ্ন করার জন্য পাঁচ মিনিটের চেয়ে কম সময় দেয়া হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, সেখানে ফলোআপের কোনো সুযোগ ছিল না।
এমনকি বড় কিছু উদ্ঘাটনেরও সুযোগ ছিল না এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে অর্ধেক তুলে ধরার কিছু ধারণা এখান থেকে বেরিয়ে এসেছে। এটাকে তুলনা করা যেতে পারে বিল গেটসের মাইক্রোসফট শুনানি, যাতে তিনি কয়েক দিনের জন্য আইনজীবী ও কর্মকর্তাদের
মুখোমুখি হয়েছেন এবং দ্য কেফাউভার শুনানি যা এক বছর ধরে চলেছে, তার সঙ্গে। পরিকল্পনা মোতাবেক এ মাত্রার একটি শুনানি আপনি একদিনে করতে পারেন না।
নাগরিক হিসেবে আমাদের জন্য এ শুনানির সবচেয়ে বাজে মুহূর্ত ছিল যখন সিনেটররা প্রশ্ন করেন, ফেসবুককে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এমন আইনকে জাকারবার্গ সমর্থন করবেন কিনা?
জাকারবার্গ ‘সৎ’ বিজ্ঞাপন, গোপনীয়তা সংক্রান্ত আইন বা সাধারণভাবে তথ্য সুরক্ষা নিয়ন্ত্রণ (জিডিপিআর) ইত্যাদিকে সমর্থন করেন কিনা, তাতে আমার কিছু আসে যায় না।
আইন তৈরিকে তিনি সমর্থন করেন কিনা, সিনেটররা জাকারবার্গকে এটি জিজ্ঞাসা করার মাধ্যমে তাকে এমন এক ধরনের দার্শনিক সম্রাটের স্তরে উপনীত করেছেন, ফেসবুক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে যার মতামত বিশেষ মর্যাদা বহন করে। এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
ফেসবুক একচেটিয়া একটি কর্পোরেট জলহস্তী হিসেবে পরিচিত। এটি অন্তত ৮ কোটি ৭০ লাখ মানুষের ব্যক্তিগত গোপন তথ্য প্রকাশ করে দিয়েছে, বিদেশি প্রপাগান্ডা ছড়িয়েছে এবং বৈষম্যকে চিরস্থায়ী করেছে।
আমাদের উচিত নয় আইনের ক্ষেত্রে ফেসবুকের অনুমোদন চাওয়া অথবা জাকারবার্গের আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্র“তি কামনা করা। আমাদের উচিত তাকে গণতন্ত্রের প্রতি একটি বিপদ হিসেবে গণ্য করা এবং একটি প্রকৃত শুনানি পাওয়ার জন্য আমাদের সিনেটরদের কাছে দাবি করা।
সেরা সিনেটররা বুঝতে পেরেছেন যে, এটি একটি শো ছিল এবং তারা একে সেভাবেই দেখেছেন। সিনেটর জন কেনেডি বলেছেন, আপনার ইউসার অ্যাগ্রিমেন্ট ভঙ্গ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম প্রশ্ন করেছেন, আপনি কি একচেটিয়া কারবারি? জাকারবার্গ হাস্যরসাত্মকভাবে উত্তর দিয়েছেন, তিনি এমনটি ‘অনুভব’ করেন না। সিনেটর রিচার্ড ব্ল–মেনথাল বলেছেন, আমাদের আইন প্রয়োজন, প্রতিশ্রুতি বা ক্ষমা প্রার্থনা নয়।
যেহেতু প্রত্যেক সিনেটরের সময় ছিল পাঁচ মিনিটের নিচে, জাকারবার্গ চেষ্টা করে গেছেন নিজের মিশন, দর্শন বা যা কিছু তিনি বিশ্বাস করেন সেগুলো বলে ঘড়ির কাঁটা সচল রাখতে।
শুনানির ক্ষেত্রে কিছু ভালো প্রশ্ন ছিল; কিন্তু ফলোআপ করার সুযোগ একেবারে ছিল না বললেই চলে। আপনি জাকারবার্গকে ভালোমতো মাপতে পারেন সময় গণনার ক্ষেত্রে ভালো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হিসেবে।
যখন কম উত্তেজিত বিষয়গুলো নিয়ে কথা হচ্ছিল, তখন তিনি সময়ক্ষেপণ করছিলেন।
উদাহরণস্বরূপ, সিনেটর হিরোনি ও বুকার উভয়ে ‘প্রোপ্রবলিকা’য় জুলিয়া অ্যাংউইনের করা জঘন্য রিপোর্ট তুলে ধরেছেন, যেখানে দেখানো হয়েছে চাকরিদাতা ও বাড়ির মালিকরা বৈষম্যমূলক বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য ফেসবুক ব্যবহার করছেন।
জাকারবার্গ কোম্পানির পক্ষ নিয়ে বলেছেন, তারা এগুলোর ব্যাপারে কঠোর ছিলেন এবং সেগুলো বন্ধ করতে তারা কমিউনিটিভিত্তিক বাধ্যবাধকতার ওপর নির্ভর করেছেন।
ফেসবুক যেসব টুল ব্যবহার করছে, তা বৈষম্যকে সহজ করে দিচ্ছে। ফেসবুকের মুনাফার সীমা বেঁধে দেয়া আছে। তাই চাইলে এটি সহজেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়ার কাজটি করতে পারে। কিন্তু ফেসবুক সেটা করতে চায় না।
হিরোনি ও বুকার এটি দেখাতে পারতেন শুনানিতে; কিন্তু অন্য সিনেটরদের মতো প্রশ্ন করার জন্য তাদের হাতে মাত্র কয়েক মিনিট সময় ছিল।
জাকারবার্গ প্রশ্নগুলোর অস্পষ্ট জবাব দিয়েছেন। তাদের মন্তব্যগুলো কেমন ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা ‘কৌতূহলোদ্দীপক’ ছিল অথবা ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করা যায়’- এমনসব জবাব দেয়ার মাধ্যমে তিনি সময় নষ্ট করেছেন।
কিছু শুনানি তো মনে হয় এভাবে সাজানো হয়েছে যে, জাকারবার্গ কতটুকু ভালো বা খারাপ মানুষ অথবা তার রাজনৈতিক দর্শন ভালো, খারাপ, এমনকি উদ্ভট কিনা, তা বের করে আনাই উদ্দেশ্য।
জাকারবার্গ আমাকে আঘাত করেছেন আত্মসেবার ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত মানুষ হিসেবে। এটি অবশ্য তাকে একটি একচেটিয়া কর্পোরেট হাউসের সিইও বানায়নি; বরং তাকে গতানুগতিক একজন শিল্প-ডাকাতই বানিয়েছে।
ঘৃণা ছড়ানো প্রশ্নগুলোকে আমরা কীভাবে মোকাবেলা করতে পারি, এ ক্ষেত্রে তার মতামত কী- জাকারবার্গকে এমন দার্শনিক প্রশ্ন করার অর্থ হল তাকে একজন গ্রহণযোগ্য দার্শনিক সম্রাট ও চিন্তাবিদ শিক্ষক হিসেবে সম্মানিত করা।
গৃহসংক্রান্ত বৈষম্যমূলক বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে তার ব্যর্থতাগুলো মেনে নেয়ার অর্থ হল শতকোটি ডলার মুনাফা কামানো একচেটিয়া ব্যবসায়ীর পরিবর্তে তাকে সীমিতসম্পদের একজন ভালো মনের অভিনেতা হিসেবে গণ্য করা।
আমার দৃষ্টিতে, ইনস্টাগ্রাম এবং অন্য সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী যেগুলোকে ফেসবুক কিনে নিয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে ফেসবুকের সম্পর্ক আমাদের ভেঙে দেয়া দরকার।
অন্তত সামান্য পরিমাণে হলেও কিছু পদক্ষেপ আমাদের গ্রহণ করা দরকার। আমাদের উচিত বৈষম্যের পথ খুলে দেয়ার জন্য ফেসবুককে দায়ী করা। আমাদের প্রয়োজন তথ্য পরিবর্তন ও ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জন করা।
কিন্তু এটিই যথেষ্ট নয়। ফেসবুকের এমন অনেক বিষয় আছে যা আমরা জানি না। আমরা জানি, আমাদের একচেটিয়া একটি কর্পোরেট হাউস আছে যা কিনা একাধিকবার নিয়মনীতির মারাত্মক লঙ্ঘন ঘটিয়েছে, যার ফলে করে আমাদের গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে।
আমরা জানি না তাদের চিন্তাভাবনা কীভাবে সংবাদ সংস্থাগুলো বা বিভিন্ন বিষয়বস্তু নির্মাতাদের বিবেচনা করে। কীভাবে ফেসবুক তার নিজস্ব ব্যবহারকারীদের তথ্য ব্যবহার করে অথবা কীভাবে প্লাটফর্মজুড়ে কেবল কয়েকটি উদাহরণ দেয়ার মাধ্যমে তাদের ট্র্যাকিং করে, তাও আমরা জানি না।
এখন প্রাথমিক লোক দেখানো শুনানি শেষ হয়েছে। আমাদের আসল শুনানি দরকার, যেখানে কোনো সিনেটরকে কয়েক মিনিট পর থেমে যেতে হবে না। আসল শুনানিতে আমাদের প্রত্যেক সিনেটরকে (যারা লাখ লাখ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে) সীমাহীন প্রশ্নের সুযোগ দেয়া হবে। যদি এটি করতে ওয়াশিংটন ডিসিতে দুই মাস সময় কাটাতে হয়, তবে দুই মাসই কাটাতে দিন।